‎হরিপুরে সবুজ স্বপ্নের স্থপতি “অক্সিজেন” ও  ইমনের অনন্য কার্যক্রম



‎গোলাম রব্বানী,হরিপুর(ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধিঃ
ঠাকুরগাঁও জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল হরিপুর উপজেলার পূর্ব তোররা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মোজাহেদুর ইসলাম ইমন। শিক্ষা জীবনে পীরগঞ্জের নাকাটি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস,এস-সি, পীরগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে এইচ,এস-সি এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর হতে ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা এই তরুণ ২০১৭ সালের ২৬ মার্চ প্রতিষ্ঠা করেন হরিপুর উপজেলার প্রথম পরিবেশবাদী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘অক্সিজেন’। একইসাথে তিনি গড়ে তোলেন উপজেলার প্রথম গণ-পাঠাগার ‘অক্সিজেন জ্ঞান সমৃদ্ধ কেন্দ্র’ যা আজ শিক্ষার আলোকবর্তিকা হিসেবে ছড়িয়ে দিচ্ছে জ্ঞানের দীপ্তি।
‎তার প্রেরণা আসে আমাদের চারপাশের মানুষদের কাছ থেকে তাদের সংগ্রাম, তাদের কষ্ট, তাদের স্বপ্ন  প্রতিনিয়ত তাকে নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করে। তিনি উপলব্ধি করেছেন, একটু সুযোগ পেলেই আমাদের তরুণরাই পারবে অসাধারণ পরিবর্তন আনতে। তার স্বপ্ন ‘অক্সিজেন’ একদিন শুধু হরিপুরেই নয়, সারা বাংলাদেশে এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একটি রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি চান প্রতিটি এলাকায় এমন উদ্যোগ গড়ে উঠুক, যেখানে মানুষ নিজেরাই নিজেদের সমাজকে সুন্দর করে তুলবেন।
‎ঐতিহ্য সংরক্ষণে ‘লোকস্মৃতি জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠা করে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতিকে তুলে ধরা হচ্ছে নতুন প্রজন্মের সামনে। মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন গাঁথা সংরক্ষণ এবং দেয়াল চিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে জাতীয় ইতিহাসকে জীবন্ত করে তুলেছেন  এক সৃজনশীল শিল্প ভাষায়। মানবিক সহায়তায়ও দিয়ে যাচ্ছেন ‘অক্সিজেন’ অনন্য। গৃহহীনদের ঘর নির্মাণ, অসহায়দের খাদ্য ও শীতবস্ত্র বিতরণ, টিউবওয়েল স্থাপন, প্রতিবন্ধীদের হুইলচেয়ার প্রদান প্রতিটি উদ্যোগেই ফুটে ওঠে মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শিক্ষা খাতে ‘অক্সিজেন’-এর অবদান এক কথায় বিপ্লবাত্মক। একটি জরাজীর্ণ মক্তব পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে তিনি যেমন ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটিয়েছে, তেমনি মেধা যাচাই পরীক্ষার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষার পথে উদ্বুদ্ধ করছেন। পাঠাগারটি এখন জ্ঞান পিপাসুদের একমাত্র প্রাণকেন্দ্র।
‎শুরুটা ছিল সীমিত পরিসরে, কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও দূরদর্শী নেতৃত্বে ‘অক্সিজেন’ আজ রূপ নিয়েছে এক বহুমাত্রিক সামাজিক আন্দোলনে। পরিবেশ সংরক্ষণে সংগঠনটির কর্মসূচি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘সবুজ হরিপুর’ গড়ার প্রত্যয়ে তিনি গড়ে তুলেছে ভেষজ উদ্যান, রোপণ করেছে তাল, কৃষ্ণচূড়া, নিমসহ নানা প্রজাতির বৃক্ষ। ‘মিশন লাল-সবুজ’ কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি শুধু পরিবেশ নয়, জাগিয়ে তুলছে জাতীয় চেতনার গভীর আবেগ যা এলাকাবাসীর মধ্যে সৃষ্টি করেছে এক অভূতপূর্ব উদ্দীপনা।

‎স্থানীয় যুব সমাজকে স্বাবলম্বী করতে সংগঠনটি চালু করেছে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোগ সৃষ্টি এবং নারীদের ক্ষমতায়নের কার্যক্রম। পাশাপাশি ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক চর্চার বিকাশেও তিনি রেখে চলেছে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

‎করোনা কালে স্যানিটাইজার প্রস্তুত ও খাদ্য সহায়তা, বন্যার সময় ত্রাণ কার্যক্রম সবখানেই তার নিরলস উপস্থিতি স্থানীয়দের আস্থা অর্জন করেছেন তিনি। এছাড়া বাল্যবিবাহ ও যৌতুকবিরোধী প্রচারণা, নারী ও শিশু স্বাস্থ্য সচেতনতা, মাদক ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে ‘অক্সিজেন’ গড়ে তুলছে একটি সচেতন, নিরাপদ ও মানবিক সমাজ।

‎স্থানীয়দের ভাষায়, ‘অক্সিজেন’ এখন শুধু একটি সংগঠন নয় এটি হরিপুরের আশা, সম্ভাবনা, আস্থা ও উন্নয়নের প্রতীক। প্রান্তিক অঞ্চল থেকে উঠে আসা এই উদ্যোগ আজ হয়ে উঠেছে এক অনুকরণীয় মডেল, যা দেখাচ্ছে সদিচ্ছা আর সৃজনশীলতাই পারে একটি সমাজকে বদলে দিতে।

‎উদ্যোক্তা মোজাহেদুর ইসলাম ইমন বলেন, ‘অক্সিজেন’ আমার কাছে শুধু একটি সংগঠন নয়, এটি আমার স্বপ্ন, আমার বিশ্বাস এবং আমার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি সবসময়ই মনে করেছেন একটি সমাজকে বদলাতে বড় কিছু নয়, দরকার আন্তরিকতা, সচেতনতা এবং মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা।

‎আমাদের হরিপুর একসময় অনেক দিক থেকেই পিছিয়ে ছিল পরিবেশ ধ্বংস, শিক্ষার অভাব, সামাজিক কুসংস্কার সব মিলিয়ে একটি নীরব সংকট চলছিল। সেখান থেকেই ‘অক্সিজেন’-এর যাত্রা শুরু। তিনি চাচ্ছেন এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে, যেখানে মানুষ নিজেরাই নিজেদের পরিবর্তনের অংশ হয়ে উঠবে। লাল সবুজের পরিবেশ তার কাছে অত্যন্ত আবেগের জায়গা। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রকৃতি বাঁচলে মানুষ বাঁচবে। সেই চিন্তা থেকেই বৃক্ষরোপণ, ভেষজ উদ্যান, ‘সবুজ হরিপুর’ গড়ার উদ্যোগ এসব শুধুই প্রকল্প নয়, এগুলো মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই। একটি গাছ লাগানো মানে শুধু একটি চারা রোপণ নয়, বরং একটি প্রজন্মকে বাঁচানোর প্রতিশ্রুতি।
‎তার কার্যক্রম শুধু পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয় শিক্ষা, মানবিক সহায়তা, যুব উন্নয়ন সব ক্ষেত্রেই তিনি কাজ করে যাচ্ছেন । কারণ তিনি মনে করেন, একটি উন্নত সমাজ গড়তে হলে সব দিক থেকেই সমন্বিত উন্নয়ন জরুরি। একটি বই যেমন একটি জীবন বদলে দিতে পারে, তেমনি একটি ছোট সহায়তাও কারো জীবনে নতুন আশা এনে দিতে পারে।
‎সর্বশেষে তিনি শুধু এতটুকুই বলছেন, “পরিবর্তন কখনো হঠাৎ আসে না, এটি তৈরি করতে হয়। আর আমি সেই পরিবর্তনের যাত্রায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি ও ভবিষ্যতে করবো ইনশাআল্লাহ।”

‎গোলাম রব্বানী,
‎হরিপুর-ঠাকুরগাঁও
‎৩০.০৪.২০২৬ ইং।