বেনাপোল প্রতিনিধি : ভারত ভ্রমণ ভিসায় আরোপিত বিধিনিষেধ এখনো পুরোপুরি প্রত্যাহার না হওয়ায় দিন দিন কমে যাচ্ছে পাসপোর্টধারী যাত্রীদের যাতায়াত। ফলে একসময় যাত্রীদের কোলাহলে মুখর থাকা বেনাপোল স্থলবন্দরের আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল এখন অনেকটাই জনশূন্য হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন ও নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ভারত সরকার ভ্রমণ ভিসায় বিধিনিষেধ আরোপ করে। পরে সীমিত পরিসরে মেডিকেল ভিসা চালু করা হলেও পর্যটন, ব্যবসা ও অন্যান্য ভিসা স্বাভাবিক করা হয়নি। এর ফলে চিকিৎসা, ব্যবসা, শিক্ষা ও পর্যটনের উদ্দেশে ভারতে যাতায়াতকারী বাংলাদেশিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
সবশেষ শনিবার (১৬ মে) সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে মাত্র ১৪২৫ জন যাত্রী ভারতে ও বাংলাদেশে যাতায়াত করেছেন।
ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম জানান, একসময় ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যাত্রীদের দীর্ঘ সারি, ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের ব্যস্ততা, ট্রাভেল এজেন্সি, মানি এক্সচেঞ্জ, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও পরিবহন খাতের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকত বেনাপোল প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল। কিন্তু বর্তমানে যাত্রী সংকটে এসব ব্যবসা-বাণিজ্যে নেমে এসেছে স্থবিরতা। ক্ষতির মুখে পড়েছেন ট্রাভেল এজেন্সি, পরিবহন শ্রমিক, হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
পাসপোর্টধারীরা জানান, ভারতে চিকিৎসা ও ভ্রমণের জন্য ভিসা পেতে এখনও নানা জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। তারা আশা করেছিলেন ভারতের নির্বাচন শেষে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। কিন্তু এখনো বিধিনিষেধ বহাল থাকায় সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি কমেনি।
বেনাপোল আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনালের ইনচার্জ আমিনুল ইসলাম বলেন, পাসপোর্টধারী যাত্রীদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হচ্ছে। তবে ভিসা জটিলতার কারণে যাত্রী সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কম। তবে আমরা আশাবাদী সামনের দিনে এ সংকট কাটবে।
বেনাপোল মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ী আবুল বাশার জানান, ভারত সরকার দ্রুত ভ্রমণ ভিসা স্বাভাবিক করলে দুই দেশের মানুষের যোগাযোগ বাড়বে, চিকিৎসা ও পর্যটন খাত পুনরুজ্জীবিত হবে এবং সীমান্ত এলাকার অর্থনীতিতে আবারও গতি ফিরে আসবে।
ঢাকা-বেনাপোল রুটে চলাচলকারী দূরপাল্লার বাসগুলোও পর্যাপ্ত যাত্রী পাচ্ছে না। এতে পরিবহন শ্রমিক, কাউন্টার স্টাফ ও সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের আয় কমে গেছে।
অন্যদিকে, স্টেশন ও টার্মিনাল এলাকায় ছোট দোকান, খাবারের হোটেল এবং ফুটপাতের ব্যবসায়ীরাও চরম বিপাকে পড়েছেন। তাদের দাবি, বেচাকেনা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।
বেনাপোল স্থলবন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন, দুই দেশের মধ্যে ভিসা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে। কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতেও যাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক জানান, দীর্ঘদিন ভ্রমণ ভিসা স্বাভাবিক না থাকলে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, দুই দেশের মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগও বাধাগ্রস্ত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বেনাপোল শুধু একটি স্থলবন্দর নয়, এটি সীমান্তকেন্দ্রিক বৃহৎ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। যাত্রী চলাচল কমে গেলে স্থানীয় ব্যবসা, পরিবহন, আবাসন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তারা বলছেন, ভিসা জট দ্রুত সমাধান না হলে সীমান্ত এলাকার হাজারো মানুষের জীবিকা আরও সংকটে পড়তে পারে। একই সঙ্গে দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগেও দূরত্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ দ্রুত ভিসা প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বেনাপোলকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, বেনাপোল বন্দর দিয়ে সড়ক ও রেলপথে পাসপোর্টধারী যাত্রীদের যাতায়াত হয়ে থাকে। তবে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই থেকে মূলত স্থলপথেই ভারত ভ্রমণের সুযোগ সীমিত আকারে চালু রয়েছে। #