অলৌকিক পুকুরে এক ডুবেই ফেরে দৃষ্টিশক্তি, মানুষের ঢল

নওগাঁ প্রতিনিধি : নওগাঁর মান্দা উপজেলার ঐতিহাসিক ঠাকুরমান্দা রঘুনাথ জিউ মন্দির প্রাঙ্গণে চৈত্র মাসের শুক্লা নবমী তিথি উপলক্ষে শুরু হয়েছে রামনবমী মেলায় ১০ দিনব্যাপী শ্রী শ্রী রামচন্দ্রের জন্মোৎসব ও রামনবমী মেলা। ‘এক ডুবেই চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়া যায়’—এমন ‘অলৌকিক’ বিশ্বাসকে ঘিরে হাজারো ঢল নেমেছে মন্দিরসংলগ্ন পুকুরে।

শুক্রবার (২৭ মার্চ) ভোর থেকেই শুরু হয় এবারের উৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। প্রতি বছরের মতো এবারও লাখো পুণ্যার্থীর পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো মন্দির এলাকা।

উৎসবকে ঘিরে ৯ থেকে ১০ দিনব্যাপী নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান চলছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত ভক্তদের উপস্থিতিতে মন্দির প্রাঙ্গণ পরিণত হয়েছে এক বিশাল মিলনমেলায়। পূজা, আরতি, প্রার্থনা ও মানতের মাধ্যমে দিনব্যাপী চলছে ভক্তদের ধর্মীয় কার্যক্রম।

জানা যায়, শত বছরের পুরনো এই মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে এক শিহরণ জাগানিয়া জনশ্রুতি। প্রচলিত আছে, বহু বছর আগে এক অন্ধ ভক্ত শ্রী রামচন্দ্রের কৃপা লাভের আশায় এখানে এসে মন্দির সংলগ্ন পুকুরে স্নান করেন। লোককথা অনুযায়ী, পানিতে ডুব দিয়ে উঠে তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান। সেই ঘটনার পর থেকেই পুকুরটি ‘অলৌকিক’ হিসেবে পরিচিতি পায় এবং ধীরে ধীরে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থানে পরিণত হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, মন্দির প্রাঙ্গণে এক আবেগঘন পরিবেশ বিরাজ করছে। নির্দিষ্ট স্থানে প্রতিবন্ধী শিশুদের শুইয়ে রেখে বাবা-মায়েরা সন্তানের সুস্থতা কিংবা চোখের আলো ফিরে পাওয়ার আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। অনেকে মানত হিসেবে টাকা-পয়সা ছিটিয়ে দিচ্ছেন। বিশ্বাস, কান্না আর প্রার্থনায় পুরো এলাকা আবেগাপ্লুত হয়ে উঠেছে।

এছাড়া নির্মাণাধীন নতুন মন্দিরের দোতলা এবং পুকুর এলাকায় পদ্মপাতা মাথায় দিয়ে শিশু-কিশোরদের পূজা করার দৃশ্য দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করছে। এসব আয়োজনে উৎসবের আমেজ আরও বেড়ে গেছে।

উৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার মনোজ কুমার এবং নওগাঁ-৪ (মান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ডা. ইকরামুল বারী টিপু। তারা মন্দির পরিদর্শন করে ভক্তদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

এসময় ভারতের হাইকমিশনার মনোজ কুমার বলেন, এই ঐতিহাসিক মন্দিরে এসে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের জন্মোৎসব উপলক্ষে মানুষের গভীর ভক্তি ও বিশ্বাস সত্যিই প্রশংসনীয়।

ঢাকা থেকে আসা ভক্ত লক্ষ্মী সরকার বলেন, এই মন্দিরটি আমাদের কাছে গভীর বিশ্বাসের স্থান। এখানে মানত করলে তা পূরণ হয় এমন বিশ্বাস বহুদিনের।

রাজশাহী থেকে আগত শুভজিৎ রায় বলেন, আমরা প্রতিবছর পরিবারসহ এখানে আসি। অনেকের বিশ্বাস, এখানে প্রার্থনা করলে সন্তান লাভ হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই এত মানুষের সমাগম।

মন্দির কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মনোজিৎ কুমার সরকার জানান, এই উৎসব কেবল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি উত্তরবঙ্গের এক বিশাল অসাম্প্রদায়িক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

সংসদ সদস্য ডা. ইকরামুল বারী টিপু বলেন, ঠাকুরমান্দার এই মন্দির শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক। এখানে প্রতি বছর লাখো মানুষের সমাগম আমাদের সহাবস্থানের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

এদিকে বিপুল জনসমাগম সামাল দিতে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

মান্দা থানার তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুল গনি জানান, পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সমন্বয়ে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে, যাতে পুণ্যার্থীরা নির্বিঘ্নে তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে পারেন।